সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) প্রযুক্তি স্টার্টআপ XPANCEO ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত হেলথটেক ইউনিকর্ন হয়ে উঠেছে। Series A ফান্ডিং রাউন্ডে মোট ২৫০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২,৯৫০ কোটি টাকা) সংগ্রহ করে কোম্পানির ভ্যালুয়েশন সরাসরি ১.৩৫ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১৬,০০০ কোটি টাকা) পৌঁছে গেছে। Opportunity Venture (Asia) এই রাউন্ডের লিড ইনভেস্টর, যারা আগে ২০২৩ সালে XPANCEO-এর সিড রাউন্ডেও ৪০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। Forbes Middle East-এর ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইস্যুতে প্রকাশিত “Top 5 Most Funded Startups In MENA In 2025” লিস্টে XPANCEO দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। এই সাফল্য শুধু UAE-এর জন্য নয়, পুরো MENA অঞ্চলের হেলথফিনটেক সেক্টরের জন্য একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছে।
XPANCEO ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা Valentyn S. Volkov এবং Roman Axelrod দুজনই বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ। তাদের স্বপ্ন ছিল চোখের লেন্সকে আর শুধু দৃষ্টি সংশোধনের যন্ত্র না রেখে, একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট ডিভাইসে রূপান্তরিত করা। আজ XPANCEO-এর মাল্টিফাংশনাল স্মার্ট কন্ট্যাক্ট লেন্স শুধু দৃষ্টি ঠিক করে না — এটি রিয়েল-টাইম হেলথ মনিটরিং করে, অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) দেখায় এবং এমনকি কর্নিয়াল অন্ধত্বের রোগীদের জন্য ইমপ্লান্ট হিসেবেও কাজ করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইতালির মেডটেক স্টার্টআপ INTRA-KER-এর সাথে মিলে তারা প্রথম প্রোটোটাইপ ইন্ট্রাকর্নিয়াল ইমপ্লান্ট উন্মোচন করে, যা কর্নিয়াল অন্ধত্বের রোগীদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে। আর ডিসেম্বর ২০২৫-এ মোহাম্মদ বিন রশিদ স্পেস সেন্টারের সাথে মিলে তারা AR স্মার্ট লেন্সের গ্রাউন্ড টেস্টিং শুরু করেছে — যা মহাকাশে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
এবার আসুন XPANCEO-এর বিজনেস মডেল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। এটি এমনভাবে ব্যাখ্যা করব যাতে বাংলাদেশের যেকোনো উদ্যোক্তা সহজে বুঝতে পারেন এবং চাইলে অনুসরণ করতে পারেন। XPANCEO মূলত একটি B2B + R&D-ভিত্তিক হাইব্রিড মডেল চালায়। অর্থাৎ তারা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে লেন্স বিক্রি করে না (এখনো), বরং বড় বড় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্পেস এজেন্সি এবং মেডিকেল কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ করে তাদের প্রযুক্তি লাইসেন্স করে বা কাস্টম প্রোডাক্ট তৈরি করে।
প্রথম ধাপ: গবেষণা ও প্রোটোটাইপ তৈরি। তারা নিজস্ব ল্যাবে স্মার্ট লেন্সের সেন্সর, মাইক্রো-ইলেকট্রনিক্স এবং অপটিক্যাল টেকনোলজি তৈরি করে। এই লেন্সে থাকে টিনি সেন্সর যা চোখের চাপ, গ্লুকোজ লেভেল, হার্ট রেট এবং অন্যান্য হেলথ ডেটা রিয়েল-টাইমে মনিটর করে। AR ফিচার দিয়ে লেন্সের মধ্যে দিয়ে ম্যাপ, ডেটা বা ডাক্তারের নির্দেশ দেখা যায়।
দ্বিতীয় ধাপ: পার্টনারশিপ ও লাইসেন্সিং। উদাহরণস্বরূপ, তারা ডায়াবেটিস হাসপাতালের সাথে কাজ করে লেন্সকে গ্লুকোজ মনিটরিং ডিভাইস হিসেবে ব্যবহার করে। স্পেস এজেন্সির সাথে AR লেন্স তৈরি করে। এতে তারা প্রতিটি প্রোজেক্ট থেকে লাইসেন্সিং ফি, রয়্যালটি এবং কাস্টম ডেভেলপমেন্ট চার্জ নেয়।
তৃতীয় ধাপ: ভবিষ্যৎ কনজিউমার সেল। এখনো প্রোটোটাইপ স্টেজে থাকলেও, পরিকল্পনা আছে সাধারণ মানুষের জন্য AR ভিশন লেন্স বিক্রি করার। তখন রেভিনিউ আসবে প্রতিটি লেন্সের বিক্রয় থেকে, মাসিক সাবস্ক্রিপশন (ডেটা অ্যানালিসিস অ্যাপ) এবং ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ থেকে।
এই মডেলের সৌন্দর্য হলো — প্রথমে বড় প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা নিয়ে R&D করে, তারপর সেই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যায়। ফলে ঝুঁকি কম এবং স্কেলিং সহজ। যদি কেউ বাংলাদেশে এমন মডেল অনুসরণ করতে চান, তাহলে শুরু করুন একটি নির্দিষ্ট সমস্যা (যেমন ডায়াবেটিস মনিটরিং) নিয়ে প্রোটোটাইপ তৈরি করে, তারপর হাসপাতাল বা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ করুন।
XPANCEO-এর এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, হেলথফিনটেক আর শুধু অ্যাপ নয় — এটি এখন আমাদের চোখের মধ্যে প্রবেশ করছে। UAE-এর এই স্টার্টআপ MENA অঞ্চলে হেলথটেকের নতুন যুগ শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে XPANCEO-এর মতো প্রযুক্তি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে দেবে।
সোর্স: Forbes Middle East English Edition – February 2026 (Top 5 Most Funded Startups In MENA In 2025)





